ভালো- বাসা









শেষ বিকালের এই নির্জনতাটুকু আমাকে খুব অস্থির করে তোলে। শেষ গোধূলির মলিন আলো পৃথিবীকে শেষবার যখন অলিঙ্গন করে বিদায় জানায় তখন মনের কোণে এক আকাশ শুন্যতা নিয়ে আমি চুপ করে ছাদের কার্নিসে বসে থাকি। আমার বুকের ভেতর প্রিয় নামের যে নদীটা বয়ে গেছে আমি তার ভাঙনের শব্দ শুনতে পাই খুব। আমার কেনোজানি মনেহয়, অদিতির মতো আমিও এমনই এক সন্ধ্যায় চিরতরে হারিয়ে যাবো। আমি হয়তো অনেক অনেক বছর ধরে সেই সন্ধ্যেটার অপেক্ষায় আছি।

আমার কাছে পৃথিবীর সবচেয়ে প্রিয় নাম হলো অদিতি। সবচেয়ে প্রিয় মুখ, প্রিয় ছবিটার নাম অদিতি। একজীবনে যে মেয়েটাকে খুব ভালোবেসেছি, খুব নিজের করে চেয়েছি আবার খুব করে হারিয়েও ফেলেছি, সেই মেয়েটার নাম অদিতি।
আমার কাছের বন্ধু রনি প্রায় সময় আমার কাঁধে হাত দিয়ে বলতো "দেখিস , একদিন এত প্রিয় নাম, এত প্রিয় মুখ কিছুই আর মনে থাকবেনা। শুধু অনেক অনেক দিন পরে অদিতি নামের কাউকে দেখলে বুকচিরে একটা দীর্ঘশ্বাস বের হবে।"?
কিন্তু আমার কখনোই এমনটা মনেহয়নি। এতো এতো ভালোবাসার শুভ্র অনুভূতি দিয়ে যে মেয়েটাকে আমি বুকের ভিতর এতটা দিন ধরে এঁকে রেখেছি তাকে ভুলে যাওয়ার সবগুলো সুত্রই আমার কাছে বৃথা।
এমন একটা সময় ছিল যখন আমার কোনো প্রিয় রঙ ছিলনা। খুব সাদামাটা ভাবেই কাটিয়ে দিয়েছিলাম আমার ছেলেবেলার জীবন। কিন্তু ইউনিভার্সিটিতে ভর্তি হওয়ার পর সবটুকু পূর্ণতা রঙে ভরে উঠেছিল আমার ছোট্ট এলোমেলো আকাশ।
ইউনিভার্সিটির প্রিয় কিছু বন্ধুবান্ধব, আড্ডা জমানো প্রিয় ক্যান্টিন,  একটা ভাড়টে ফ্লাটের দ্বিতীয় তলার দুটি রুম আর ভালোবাসার প্রিয় অদিতিকে নিয়ে মুখরিত হয়ে উঠেছিল আমার অন্যরঙের জীবন।
অদিতি আর আমি একই ডিপার্টমেন্টে পড়তাম। এডমিশন নেওয়ার একবছর যেতে না যেতেই আমরা দুজন কেমন করে যেন খুব প্রেমে পড়ে গিয়েছিলাম। যাকে বলে পাগল পাগল প্রেম। একটা মানুষ জীবনে যে এতটা পূর্নতা এনেদিতে পারে তা আগে কখনোই আমার জানা ছিলনা।
অদিতি আমার জীবনের সবটুকু জুড়ে ছিল। আমি যেদিকে চাইতাম, যা কিছু ছুঁয়ে দেখতাম সবকিছুতেই অদিতিকে খুঁজে পেতাম।
কতগুলো শেষবিকেল যে আমরা হাত ধরে বসে থেকেছি! ছায়াবীথি কৃষ্ণচূড়া থেকে কতকত লালফুল যে ঝরে গেছে আমাদের ছুঁয়ে দিতে, সেসবের হিসেব রাখিনি কখনো।
অদিতির খুব হতাশ মনে আমার হাত ধরে বলতো "জানো আকাশ, যখন তোমার হাত ধরে বসে থাকি তখন বুকের ভেতর একটা নদী বয়ে যায়। শান্ত-শীতল নদী। আমার সবসময় সেই নদীর জলে পা ডুবিয়ে বসে থাকতে ইচ্ছেকরে।"
সেই মুহুর্তে আমার কি বলা উচিত তা খুঁজে পেতামনা। আমি চুপচাপ অদিতির মুখের দিকে চেয়ে থাকতাম। পোষা কবুতরের মতো ধিরেধিরে চোখের পলক ফেলা, অধরে একটা ছোট্ট নীলচে তিল, অদ্ভুত মায়ামাখা মুখ আমাকে যেন এক অন্যজগতে নিয়ে যেতো। মানুষের বুকের ভিতরে যে এতটা প্রেম লুকিয়ে থাকতে পারে অদিতির পাশে না বসলে আমি হয়তো কখনোই তা অনুভব করতে পারতামনা।
আমার খুব কবিতা লিখতে ইচ্ছে করতো। আমাদের প্রিয় মুহুর্তগুলো, প্রিয় গাছ, অনন্তকাল হারিয়ে যাওয়া অদিতির দুটি কাজল চোখ নিয়ে কবিতা লিখতে ইচ্ছে করতো। আমাদের দু তলা ফ্লাটের ছাদের ওপর রোজ সন্ধ্যায় অনেক্ষন চোখবুজে দাঁড়িয়ে থাকতাম।
আমার মনেহত, পৃথিবীতে আমি আর অদিতি ছাড়া আর কোনো মানুষ নেই, কোনো প্রেম নেই।
.
আমার মতো এমন বোকা টাইপের ছেলে-যে ইউনিভার্সিটি পড়ুয়া সমবয়সী কোনো সুন্দরী মেয়েকে পটিয়ে চুটিয়ে প্রেম করতে পারবে সেটা হয়তো শুধুমাত্র বাংলা সিনেমাতেই সম্ভব ছিল। কিন্তু আমি এই অসম্ভব কাজটা সম্ভব করেছিলাম আমার প্রিয় বন্ধু রনির বুদ্ধির কারণে। সেই হাইস্কুল লেভেল থেকেই আমার এই বন্ধুর ভেতরে লাভগুরু টাইপের একটা ব্যাপার স্যাপার ছিল। যার ফলে স্কুলের রিতা ম্যাডামের মেয়ে "রেখা" থেকে শুরু করে আজ অবদি তার প্রেমের সংখ্যা বিশের কোঠায় গিয়ে পৌঁছিয়েছে।
তবে অদিতির বিষয়টা ছিল অন্যরকম। ইউনিভার্সিটির এক সিনিয়রের ওপর শোধ নিতে গিয়ে একদিন রনি আমার হাতে একটা গোলাপ ধরিয়ে দিয়ে মাথায় চাটিমেরে বলে "বন্ধু তুই যদি অদিতির সাথে প্রেম করতে পারিস তাহলে ঐ শালা সায়ন তোদের দেখে পুড়ে ছারখার হয়ে যাবে এবং ওর ঐ প্যাচার মতো মুখটা দেখে আমার ভীষণ আনান্দ হবে। আর আমি সেই আনান্দে তোকে সপ্তাহে দুইদিন বিরিয়ানি খাওয়াবো। প্লিজ তুই রাজি হ।"
সায়ন আমাদের ইউনিভার্সিটির এক সিনিয়র । অদিতির সাথে প্রায় সময় ফ্লার্ট করার চেষ্টা করে এটা আমাদের নজর এড়ায়নি। অদিতির আশেপাশে ঘুরঘুর করে, ক্লাস শেষ হলে ওর পিছুপিছু রাস্তা ধরে। তবে অদিতি ওকে পাত্তা দেয় না। সায়নদার  সাথে সেদিন একটা বিষয় নিয়ে রনির ঝামেলা বাধে। সেই কারণেই আমার এই বন্ধু আমাকে দিয়ে এই চক্রান্ত করাতে চায়।
আমি সেদিন রনির হাত থেকে গোলাপটা নিয়ে সোজা রুমে চলে এসেছিলাম। অদিতিকে প্রথম থেকেই আমার ভাললাগতো। ও ছিলো খুব শান্ত স্বভাবের। কিন্তু কেনোজানি ওকে আমি ভয় পেতাম। একসাথে পড়তাম ঠিকই কিন্তু ওর সামনে দাড়িয়ে আমি ঠিকভাবে কথা বলতে পারিনি একদিনও। আর সেই অদিতিকে আমি করবো প্রেমনিবেদন!! সম্ভব নয়।
কিন্তু আমার শেষ রক্ষা হয়নি। সেদিন সন্ধ্যেবেলা রনি রুমে এসে আমাকে বেদম প্রহার করে এবং শেষমেশ আমার হাতেপায়ে ধরে সপ্তাহে তিনবার বিরিয়ানি খাওয়ানোর কথা দিয়ে আমাকে রাজি করায়।
পরেরদিন সকালে আমি দুরুদুরু মনে অদিতির সামনে গিয়ে দাড়াই। তারপর ব্যাগ থেকে একটা গিফ্টের প্যাকেট বেরকরে ওর হাতে ধরিয়ে দিয়ে দাঁত কেলাতে কেলাতে বলি
"অদিতি, এটা তোর জন্য। আজরাতে যখন ভীষণ সুন্দর একটা চাঁদ উঠবে আকাশে,তখন বারান্দায় দাড়িয়ে এটা খুলবি।"
অদিতি বড়বড় চোখে আমার দিকে তাকায়। তারপর আকাশের দিকে তাকিয়ে আমাকে বলে "আজ কি পশ্চিম দিকে সূর্য উঠেছিল! নাকি উত্তর দিকে!
আর ভাবুকের মতো এমন গিফ্ট দিচ্ছিস! মতলবটা কি শুনি??"
অদিতির কথার কোনো উত্তর না দিয়ে আমি ক্যাম্পাস থেকে বেরিয়ে যাওয়ার জন্য গটগট করে হাঁটা ধরলাম। গেটের কাছে আসতেই পিছন ফিরে দেখলাম অদিতি কৌতুহল ভরা দৃষ্টিতে আমার দিকে তাকিয়ে আছে। ঠিক সেই মুহূর্তে আমার বুকের ভেতর দারুন ভূমিকম্প শুরু হলো। আমি প্রাণপণে ওখান থেকে বাড়িতে দৌড়িয়ে পালিয়ে এলাম।
অদিতির দেওয়া গিফ্ট বক্সের ভেতরে একটা মেরুন কালারের শাঁড়ি, একটা গোলাপ আর গোলাপের সাথে লটকানো একটা চিরকুট ছিল।
চিরকুটে লেখা ছিল.......
'তোমাকে দেখলেই বুকে ফাগুন নামে, তোমাকে দেখলেই ভেজে শহর আমার।
তোমাকে লিখি প্রেম হলুদ খামে, ছুঁয়ে দাও হয়ে যাক গল্প এবার।
যদি একবার হাসো
যদি একবার পাশে বসো!!
আমি আরশী সাজাবো মেঘের ডানায়
নিরবে কহিবো চোখে "ভালোবাসো??"।'
.
অদিতি সেদিন রাতে চাঁদের আলোয় চিরকুটটা পড়েছিল কিনা আমি জানিনা। কিন্তু সেদিন রাতে আমার ভীষন জ্বর এসেছিল। চোখমুখ জ্বলে যাচ্ছিল। আমি অধৈর্যের মতো খাটের ওপর শুয়ে হাতপা ছুড়ছিলাম।
একটু একটু মনেপড়ে কিছুসময় পরপর রনি এসে আমার গায়ে হাত দিযে  বলে "এই শালা এমন করছিল কেন। অসময়ে এতো জ্বর বাঁধালি কিভাবে!"
তারপরে আর কিছুই আমার মনে নেই। কখন জ্ঞান হারিয়েছি আবার কখনো প্রলাপ বকেছি।
পরেরদিন সকালে ঘুম থেকে উঠে দেখি আমি হাসপাতালের ধবধবে সাদা বিছানায় শুয়ে আছি। কিছুক্ষন পর রনি এসে আমার সামনে দাড়িয়ে বলে "তোর হঠাৎ কী হয়েছিল বলতো! আগে কখনোই তো তোর এমন হতে দেখিনি।"
ওর কথা শুনে আমি হাসপাতালের দেয়ালের দিকে তাকাই। হঠাৎ করেই অদিতির কথা মনেপড়ে।"অদিতি কি চিরকুটটা পড়েছিল!!"
আমি ঘামতে থাকি। বুঝতে পারি আবার জ্বর নামছে শরীর জুড়ে।
.
এর দুদিন পরের কথা। সকাল বেলা আমি রুমে শুয়ে শুয়ে আঙ্গুর খাচ্ছিলাম। হঠাৎ দেখি অদিতি আর রিয়া সোজা আমার রুমে। আমি লাফিয়ে উঠে বসি। অদিতি আমার রুমে এসে কিছুক্ষন এদিকে-ওদিকে তাকায় তারপর আমার সামনে দাড়িয়ে বলে "প্রথমে চিরকুটটা পড়ে ভেবেছিলাম কানের নিচে দুটা দেবো। কিন্তু শাড়িটা আমার বেশ পছন্দ হয়েছে। তুমি কি আজ বিকেলে পার্কে আসতে পারবে?"
আমি বিস্ময়ভরা দৃষ্টিতে অদিতির দিকে তাকিয়ে থাকি আর আঙ্গুর খাই। অদিতি আমার সামনে ঝুকে এসে বলে "তোমার বন্ধুর কাছে সব শুনেছি। তোমার জ্বরের রহস্যটাও আমি তোমার বন্ধুকে জানিয়ে দিয়েছি। বিকেল চারটা নাগাদ আমি তোমার জন্য পার্কে অপেক্ষা করবো।"
আমি হা করে শুধু তাকিয়ে ছিলাম। কিছুই বলতে পারছিলাম না।
অদিতি ওর ব্যাগটা নিয়ে চলে যাওয়ার জন্য পা বাড়ায়। তখন রিয়া আমার কানের পাশে মুখ নিয়ে এসে বলে "তোরতো কেল্লা ফাতে। কাপুরুষ থেকে এবার একটু বীরপুরুষ হ গান্ডু।

রিয়া আমাদের ক্লাসমেট। রিয়ার কথা শুনে আমি ক্যাবলাম মতো বসে থাকি। এই প্রথম মনেহতে থাকে "যে অদিতিকে এতদিন শান্তশিষ্ট ভীতু বলে জেনেছি সেই অদিতি আসলে আমার থেকেও অনেকবেশী সাহসী।"
আমি উদাস হয়ে ওদের চলে যাওয়া দেখতে দেখতে হঠাৎ দেখি রনি দরজায় হেলানদিয়ে অগ্নিমূর্তির মতো আমার দিকে চেয়ে আছে। আমি অসহায়ের মতো ওর দিকে তাকিয়ে দাঁত কেলাই। ও এসে আমার মানিব্যাগে লুকিয়ে থাকা একমাত্র পাঁচশো টাকার নোটটা বের করে নিতে নিতে বলে "তোরতো শুধু গোলাপ আর চিরকুট দেওয়ার কথা ছিল, শাড়ী দিলি ক্যানো??
শালা, ডুবে ডুবে জল খাবে আর আর আমি কিছুই জানতে পারবো না?? মনেকর এই পাঁচশো তুই আমাকে ট্রিট দিলি। পরবর্তি বাঁশ খাওয়ার জন্য রেডি থাকিস।"
.
এরপরের গল্পটা ছিল অনেকটা উপন্যাসের মাঝখানের দৃশ্যগুলোর মত।
অদিতি আর আমি এই শহরের নির্জন রাতগুলোই গুচ্ছগুচ্ছ স্বপ্ন ভাসাতাম নির্মল আকাশে।
তবে আমার বন্ধু রনি সপ্তাহে তিনদিন  বিরিয়ানি খাওয়ানোর যে কথা দিয়েছিলে তা সে রক্ষা করেনি। বরং আমিই ওকে মাসে একবার বিরিয়ানি খাওয়ানোর অফার করতাম। ওর হাত ধরে বলতাম "আমাদের জন্য প্রার্থনা কর ভাই। সবকিছু যেন ঠিকঠাক থাকে।" রনি মুখের ভেতর মাংসের টুকরো  নিয়ে অস্পষ্টভাবে বলতো "তোদের জন্য জীবন দিয়ে দেব বন্ধু।"
.
একদিন পৌষের কুয়াশা ভেজা সকালে অদিতি আর আমি হেঁটে চলেগিয়েছিলাম শহরের কোলাহল ছেড়ে এক নির্জন পৃথিবীতে। সারিবাঁধা লম্বালম্বা দেবদারু গাছের নিচে একটা কাঠের বেঞ্চে বসে অদিতিকে বললাম "একটা কবিতা শুনবে! কাল সারারাত জেগে লিখেছি।"
অদিতি উজ্জল চোখে আমার দিকে তাকিয়ে বললো "প্রিয় উপন্যাসগুলো পড়তে পড়তে কতবার ভেবেছি কেউ একজন আমার দুই হাত ধরে অদ্ভুত সুন্দর এক কবিতা শোনাবে আর আমি চোখ বড়বড় করে তার কবিতা শুনবো।"
আমি অদিতির হাতধরে সেদিন ভারি গলায় আমার প্রথম লেখা কবিতাটা শুনিয়েছিলাম।
কবিতা বলার পরে আমি যখন ওর থেকে চোখ ফিরিয়ে চারপাশে তাকাই তখন সবকিছু কবিতার মত সুন্দর লাগছিল।
সেদিন সেই অদ্ভুত সকালে আমি অনুভব করলাম, পাশে বসেথাকা এই মায়াময় অদিতিকে নিয়ে আমি অনন্তকাল বেঁচে থাকতে চাই অচেনা কোনো শীতের দেশে। যেখানে সবুজ ঘাসের ডগায় শিশিরবিন্দু খেলা করে।
.
কিন্তু আমার এই একটুকরো সোনালী স্বপ্নটা একদিন মেঘ হয়ে যায়। শীতের রুক্ষতায় গাছের পাতাগুলো যেমন ঝরে যায় দিনের শেষে, আমার বেলায়ও তেমনই হয়েছিল। অনেক অনেক তারার ভীড়ে আমি আমার প্রিয় তাঁরাটিকেই একদিন হারিয়ে ফেলেছিলাম অন্ধকারে।
অদিতি ছিল একটা সাধারণ হিন্দু পরিবারের মেয়ে, আর আমি মুসলিম। আমি আকাশ হোসেন ।
আমাদের দুজনের ব্যাবধানটা ছিল খুব বেশী। অদিতি প্রায়সময় খুব আনমনা হয়ে বসে থাকতো। আমি ওর চোখের দিকে তাকিয়ে বুঝতাম আমাকে হারিয়ে ফেলার কী তিব্র ভয় নিয়ে ও জেগে থাকে।
আমি ওর হাতধরে ভরসা দিতাম '"দেখো অদিতি, আমাদের এই একসাথে থাকা, এতো ভালবাসা, এত মায়া এগুলো কখনো আমাদের দূরে যেতে দেবেনা। আমরা বারবার আমাদের কাছে ফিরে আসবো খুব প্রিয় কোনো গল্পের মতো।"
অদিতির দুচোখে তখন আষাঢ় নামতো। আমাকে শক্তকরে জরিয়ে ধরে বলতো "জীবনের শেষ মুহুর্ত পর্যন্ত আমি এভাবে তোমাকে ছুঁয়ে থাকতে চাই, খুব করে চাই।"
.
সময়টা ছিল ২০০৮ সালের মে মাস। আমাদের থার্ড সেমিস্টারের পরীক্ষা শেষে তখন অবকাশ কালীন ছুটি চলছিল। ছুটি কাটাতে অদিতি চলেগিয়েছিল ওর বাবার বাড়ি দিনাজপুরের । আর আমি চলে এসেছিলাম গ্রামের বাড়ি বর্ধমানে। এই সময়ে আমাদের যোগাযোগ খুব কমই হতো। কিন্তু অদিতিকে নিয়ে আমার ভাবনা থেমে থাকেনি। আমি রোজ আমার বিষণ্ন সব সুর মেলাতে অদিতিকে ভাবতাম। কিন্তু আমি কখনোই ভাবিনি এই অবকাশ কালীন ছুটি আমাদেরকে এতটা দূরে নিয়ে যাবে, এই চলেযাওয়া অদিতির শেষ চলে যাওয়া হবে।
এপ্রিলের ২৮ তারিখ রাতে অদিতির বিয়ে ঠিককরা হয়। অদিতির বাবা ছিলেন রাশভারী একজন গম্ভীর মানুষ। অদিতি যখন ওর বাবার কাছে আমার কথা বলে তখন ও জানতো ওর বাবা কখনোই আমার মতো একজন মুসলিম ছেলের হাতে অদিতিকে তুলে দেবেনা। অদিতিকে অনেকটা জোর খাটিয়ে বিয়েতে রাজি করানো হয়।
আমি এসবের কিছুই জানতাম না। সেদিন সন্ধ্যেবেলা অদিতি আমাকে ফোনকরে সবকিছু বলে। আমি ওকে বাড়ি থেকে বেরিয়ে আসতে বলি। কিন্তু ও রাজি হয়নি। ওর সবচেয়ে বড় পিছুটান ছিল ওর মা। কাঁদতে কাঁদতে বলেছিল "দেখ আকাশ, সেই ছোট্টবেলা থেকে যে মানুষগুলো এত মমতা দিয়ে আমাকে বড় করেছে, আমি তাদের সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করতে পারবোনা। তবে তুমি আমাকে ভুল বুঝোনা। একজীবনে যে ভালবাসার আসনে তোমাকে আমার হৃদয়ে বসিয়ে রেখেছি, সেখানে অন্যকেউ প্রবেশ করতে পারবেনা কখনো।"
আমি সেদিন মিনতি করে অদিতিকে বলেছিলাম বাড়ি থেকে বেরিয়ে আসতে। অদিতি শুধু একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে ফোনটা কেটেদিয়েছিল।
আমার বুকের ভিতরটা ভেঙেচুরে যাচ্ছিল। বারবার শুধু মনেহচ্ছিল, "এতদিন যে মেয়েটা আমার সবটুকু জুড়ে ছিল সেই মেয়েটা আমার হবেনা! কখনোই আমার হবেনা!!"
সেদিন শুধু নিজের কষ্টটা আমি বুঝেছিলাম। অদিতির ভিতরে যে ভয়ঙ্কর ঝড় বয়ে চলছিল তা আমি বুঝিনি। বুঝেছিলাম আরো একটুপরে।
রাত এগারোটার দিক আমার ফোনে অদিতির ছোট বোন শর্মিলার কল আসে। আমাকে জানানো হয় অদিতি বিষ খেয়েছে। সিরিয়াস অবস্থা।  হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে তাকে।
খবরটা শোনার পরে আমি আর রনি উর্দ্ধনিঃশ্বাসে দিনাজপুরের পথে পা বাড়িয়েছিলাম। আমার দম বন্ধ হয়ে আসছিল। অদিতির শেষ কথাগুলো কানে বাজছিল।
ভোরবেলা যখন আমি গিয়ে পৌঁছুলাম তখন বৈশাখের সুনীল আকাশ রং পাল্টে অন্য রূপ ধারণ করেছে।
জানতে পারলাম অদিতি হারিয়ে গেছে চিরকালের মত। ও আমাকে ঠকায়নি, ওর বাড়ির মানুষদের বিশ্বাসও ভাঙেনি।
আমি টলতে টলতে অদিতির বাড়িতে যখন পা রাখলাম তখন ওর বাড়ির উঠোনের শোয়ানো ছিল। অদিতির পাশে এসে দাড়াতেই বুকের ভেতরে একটা মোচড় দিয়ে ওঠে। অদিতির ফ্যাকাসে মুখের দিকে তাকিয়ে আমি সেদিন উপলব্ধি করেছিলাম, কতটা দুঃখবোধ, কতটা ভালোবাসা একান্ত নিজের করে নিয়ে মেয়েটা শুয়ে আছে।
শেষবারের মতো ওর হাতটা একবার ছুঁয়ে দিতে ইচ্ছে করছিল। কিন্তু পারিনি। অদিতির বাবা আমার জামার কলার ধরে সরিয়ে দেয়। বলে "তুই একটা কুলাঙ্গার। তোর জন্যই আমার মেয়ে মরেছে। তোকে আমি পুলিশে দেবো।"
সেদিন রাত দশটার সময়  থানারমোড় শশ্মানঘাটে অদিতির শবদেহ পোড়ানো হয়। আমি কিছু দূরে বসে একদৃষ্টিতে তাকিয়ে ছিলাম অদিতির প্রজ্বলিত চিতার দিকে। একজীবনের এত ভালবাসার প্রিয় অদিতিকে এভাবে চোখের সামনে মিলিয়ে যেতে দেখবো তাকি কখনো ভেবেছিলাম আমি!!!
সেদিন সারারাত আমি ঐ শশ্মানঘাটে বসেছিলাম। তার পরেরদিনও বসেছিলাম। তারপরের পুরো একসপ্তাহ আমি ঐ শশ্মানঘাটে বসেছিলাম।
রনি অনেক বুঝিয়ে, অনেক জোর করেও আমাকে উঠাতে পারেনি। রনি আমার কাঁধে হাত দিয়ে বলতো "একদিন সব ঠিক হয়ে যাবে দেখিস। এত প্রিয় নাম, এত প্রিয় মুখ কিছুই আর মনে থাকবেনা। শুধু অনেক অনেক দিন পরে অদিতি নামের কাউকে দেখলে বুকচিরে একটা দীর্ঘশ্বাস বের হবে।"
আমি রনির কথা যেনো শুনতে পেতামনা। আমি অদিতির কথা ভাবতাম। অদিতির সাথে কাটানো মুহুর্তগুলোর কথা ভাবতাম। চিৎকার করে উঠতাম। মনেহত আমি স্বপ্ন দেখছি। মনেহত অদিতি বেঁচে আছে, ও ফিরে আসবে। কিন্তু পরেক্ষনে ওর ফ্যাকাসে মুখটা আমার চোখে ভেসে উঠতেই আমি পাগলের মত হয়ে যেতাম।
শেষের দিকে একদিন অদিতের বাবা এসে আমার পাশে বসে তারপর অসহায়ের মতো কাঁদতে থাকে। একসময় আমার হাতে হাত রেখে ধরা গলায় বলে "ফিরে যাও বাবা, অদিতি যেভাবে হারিয়ে গিয়েছে, নিজেকে সেভাবে হারাতে দিওনা। ফিরে যাও.."
সেদিন আমি উঠে দাড়িয়েছিলাম। আকাশের দিকে তাকিয়ে একবার বুকভরে শ্বাস নিতেই মনেহয়েছিল আমি অদিতির গন্ধ পাচ্ছি।
আমার কারণেই অদিতি মারাগেছে এই অপরাধবোধ আমাকে গ্রাস করে ফেলেছিল ভয়ঙ্কর ভাবে।
আমি পালাতে শুরু করেছিলাম। প্রথমে দিনাজপুর ছেড়ে তারপর বাড়ি ছেড়ে, তারপর একসময় দেশ ছেড়ে।
.
২০১০ সালের জানুয়ারি মাসে আমি চলে আসি কানাডার এই অটোয়া শহরে। অদিতিকে ছাড়াই এই বিষণ্নতাই ছেয়ে থাকা শীতল শহরে কেটে গেছে আটটি বছর। প্রথম প্রথম এখানে নিজেকে মানিয়ে নিতে কষ্ট হয়েছিল খুব। এই শহরের শীতল জলবায়ু আর বুকে ভেতর জড়িয়ে রাখা তিব্র কষ্টবোধ আমাকে একটা রাতও শান্তভাবে কাটেতে দেয়নি। সেন্ট লরেন্স নদীর তীব্র শীতল স্রোত আজো মনেহয় আমার বুকের ভিতর আছড়ে পড়ছে। আমি জেগে থাকি। অনেক রাত পর্যন্ত জেগে থাকি।
রাতের বেলা জানালার পর্দা সরিয়ে দূরে দিগন্তের দিকে তাকাই। আবছায়া চাঁদের আলোয় জানালার বাইরে বরফের স্থূপগুলো ঝিঁকমিঁক করে ওঠে। এই মায়াঘেরা আলো আঁধারির অন্ধকারে আমার মনেহতে থাকে, এখানে কোথাও হয়তো অদিতি লুকোচুরি খেলছে ইরোকিয়ান মেয়েদের মতো।
অদিতির জন্য আমার ভীষণ কষ্ট হয়। মাঝেমাঝে খুব ফিরে যেতে ইচ্ছেকরে প্রিয় জন্মভূমিতে। পার্বতীপুরের আর্দ্র বাতাসে আরো একবার বুকভরে নিঃশ্বাস নিতে ইচ্ছে করে। চোখবুজলে অদিতির মৃত মুখটা চোখের সামনে ভেসে ওঠে। নিজেকে বড্ড অপরাধি মনেহয়। মনেহয় আমিই আমার অদিতিকে মেরে ফেলেছিলাম অনেক বছর আগে।
যে মেয়েটা আমাকে ভালোবেসে স্বেচ্ছায় মৃত্যুকে বরণ করে নিয়েছিল, আমি তার জন্য কিছুই করতে পারিনি।
অদিতি আমাকে কতটা ভালোবেসেছিল। একা একা নিজের ভেতর কতটা ব্যাথা, কতটা বিষাদ পুষেছিল! সেই ব্যাথাতুর বিষাদ গায়ে মেখে সাদা বরফে ঢেকে থাকা অটোয়ার নিঝুম পথে রোজ ম্যাপল পাতা ঝরে পড়ে।
অদিতি কি ভীষণ ভালোবাসার মায়াজালে আমাকে এখনো বেঁধে রেখেছে তা আমি এই সন্ধ্যের আলোই আলবার্ট স্ট্রিটের পাশে দাড়িয়ে থাকা আটতলা ভবনের ছাদে দাড়িয়ে তুষারপাত দেখতে দেখতে আজও অনুভব করি।


                        ........................

      লেখায় - আকাশ [ ক্যানাডা নিবাসী ]



লেখা সম্পর্কে কমেন্ট করে জানান । নুতুন সব লেখা পেতে চোখ রাখুন আমাদের ব্লগ , ওয়েবসাইট ও ফেসবুক পেজে  । 

কারন,
আমরা গল্প লিখি না ..
জীবনের গল্প বলি ।

   আরও পড়ুন , ফুলশয্যা

ভালো- বাসা ভালো- বাসা Reviewed by Bongconnection Original Published on November 12, 2018 Rating: 5

No comments:

Wikipedia

Search results

Powered by Blogger.